চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সংবাদ সম্মেলন

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বছরে জ্বালানি ব্যয় বাড়তে পারে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার

দেশের ৭০-৮০ শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তেলের দাম বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। ২০২৬ সালজুড়ে তেলের দাম যদি ১০০ ডলারের বেশি থাকে, তাহলে দেশের জ্বালানি ব্যয় ৪-৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে। এজন্য এখনই বিকল্প জ্বালানি, বিশেষত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে হবে। রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান। ‘‌ডিকার্বনাইজেশন পাথওয়েজ ফর এসএমইস আন্ডার বাংলাদেশ স্মল অ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিক)’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গবেষণায় এসএমই ক্লাস্টারের কারখানাভিত্তিক জ্বালানি ব্যবহার ও নিঃসরণের মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহগবেষক সাবরিন সুলতানা ও নাজিফা আলম তোরসা।

সংবাদ সম্মেলনে এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এটি অর্জন কেবল একটি জলবায়ু ইস্যু নয়; বরং অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার কৌশলও।’

তিনি বলেন, ‘বিসিকের মতো ক্লাস্টারগুলোয় রুফটপ সোলার, গ্রিন ফাইন্যান্সিং এবং জ্বালানি দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিলে একটি শক্তিশালী ও স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। ট্যাক্স বেনিফিট, ইনসেনটিভ এবং উদ্ভাবনী অর্থায়ন আমাদের আর্থিক বোঝা ও ঋণের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান গবেষক আরো বলেন, ‘চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আগে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলারেরও কম ছিল। যুদ্ধ শুরুর পর তা ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। আমাদের আশঙ্কা, ২০২৬ সালজুড়েই তেলের দাম ১০০ ডলারের বেশি থাকবে। ব্যারেলপ্রতি দাম ১০ করে বেড়ে ৮৫ ডলারে থাকলেও প্রতি মাসে প্রায় ৮ কোটি ডলার বাড়তি ব্যয় হবে বাংলাদেশের। বছর শেষে যা প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। আর তেলের দাম যদি ১০০ ডলারের বেশি থাকে, তাহলে তা প্রায় ৪-৫ বিলিয়ন ডলারে ঠেকবে।’

জাকির হোসেন বলেন, ‘এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে, আমদানিনির্ভরতা কখনো পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। যেকোনো সংঘাতে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। আবার যেকোনো সমস্যা নতুন করে সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে দেয়। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটা এখন না হলে আর কখনো হবে না। এজন্য বর্তমান সরকারকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রাকে শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আমাদের এসএমই খাতের জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে, যা দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি।’

তিনি আরো বলেন, ‘চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর তাদের ছোট ব্যবসাগুলোকে গ্রিডের অস্থিরতা এবং আমদানীকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে সুরক্ষা দিয়েছে, যা কর্মসংস্থান ও সক্ষমতা হারানো ছাড়াই সম্ভব হয়েছে।’

গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির মূলে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিলে বিসিক শিল্পনগরীগুলো থেকে বছরে ১৪ দশমিক শূন্য ৯ মিলিয়ন টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। এর মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিটের সুবিধা ব্যবহার করে বছরে প্রায় ৪ লাখ ডলারের রাজস্ব আহরণ হতে পারে। চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের সাফল্যকে মডেল হিসেবে নিয়ে বাংলাদেশের এসএমই খাত বিকেন্দ্রীভূত রুফটপ সোলার প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের পরিচালনা ব্যয় ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত মান বজায় রেখে বিশ্ববাজারে রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

দেশের শিল্প ইউনিটের ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর জ্বালানির কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে গবেষণায় বলা হয়, বর্তমানে দেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশের বেশি এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত; যা শিল্প খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োগ করে এবং জিডিপিতে ২৫-৩০ শতাংশ অবদান রাখে। তা সত্ত্বেও এ খাতটি এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যার প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক, যা বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে উচ্চ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বাংলাদেশে ২০৩৫ সালের মধ্যে জ্বালানি খাত থেকে ৬ কোটি ৯৮ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা শিল্প খাতের জ্বালানি রূপান্তরকে জরুরি করে তুলেছে।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণায় বলা হয়, চামড়া, প্লাস্টিক উৎপাদন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং হালকা প্রকৌশল খাত সম্মিলিতভাবে বছরে আনুমানিক ৪ কোটি ৭ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে। কারিগরি পদক্ষেপ নিলে চামড়া শিল্প থেকে ১৯-৩৩ শতাংশ, হালকা প্রকৌশল খাত থেকে ১৯-৩১ শতাংশ, প্লাস্টিক উৎপাদন থেকে ৩৩-৪৯ শতাংশ এবং প্লাস্টিক প্যাকেজিং খাত থেকে ১৫-২৮ শতাংশ পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব। বিসিক শিল্পনগরীর মাত্র ১০ শতাংশ খালি জায়গা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ৫৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করে বছরে প্রায় ৫১ হাজার ৪৪১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।

এসএমই খাতে স্বল্প সুদে অর্থায়নের অভাব, উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কারিগরি জ্ঞানের ঘাটতি ও মানসম্মত জ্বালানি অডিট ব্যবস্থার অনুপস্থিতির মতো কাঠামোগত বাধা রয়েছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি শিল্পনগরী পর্যায়ে অংশীদারত্বমূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ওপেক্স ও স্বল্প সুদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়নের মতো উদ্ভাবনী আর্থিক মডেল প্রবর্তন করা এবং বিসিক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করার কথাও বলা হয় এতে।

আরও